priyonaogaon@gmail.com শুক্রবার, ১৪ই জুন ২০২৪, ৩১শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

পাটচাষে আগ্রহ হারাচ্ছে নওগাঁর কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:
২৮ সেপ্টেম্বার ২০২৩, ২২:১৭

সংগৃহিত

‘আগে পাট বিক্রি করে ইলিশ কিনতাম। এখন সেই ইলিশও হারিয়ে গেছে, পাটের দামও নেই’—কথাগুলো বলছিলেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার গণেশপুর গ্রামের পাটচাষি আব্দুল কুদ্দুস। উপজেলার সতিহাটে পাট বিক্রি করতে এসে আশানুরূপ দাম না পেয়ে একথা বলেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে পাটের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন নওগাঁর চাষিরা। চলতি বছরে অনাবৃষ্টি ও খরার কারণে পাটের ফলন যেমন কম হয়েছে, তেমন বেড়েছে খরচ। পাট জাগ দেওয়া নিয়েও বিপাকে পড়তে হয় তাদের। বর্তমান বাজারে পাটের যে দাম, সেই দাম নিয়ে শঙ্কার মধ্যে দিন পার করছেন চাষিরা। চাষের খরচ তোলা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন তারা। দাম কমে যাওয়ার জন্য চাষিরা সিন্ডিকেটকে দুষছেন।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের কাছে এখনো গতবছরের পাট রয়েছে। মিলমালিকদের কাছে পাট বিক্রি করলে ঠিকমতো টাকা দেয় না। এজন্য তারা পাট কিনছেন কম।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় চলতি বছরে পাঁচ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে চার হাজার ৫৬০ হেক্টর। গত পাঁচ বছরে জেলায় পাটের আবাদ কমেছে প্রায় এক হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে।

চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাট চাষের সময় এবার নানা বিড়ম্বনার শিকার হন চাষিরা। প্রথমত, বীজ বপনের সময় খরা হওযায় ঠিকমতো চারা গজায়নি। আবার চারা গজালেও পাতলা হয়েছে। এতে ব্যাহত হয়েছে পাটের ফলন।

অথচ শ্রমিকের বাড়তি মজুরি, সেচ, বীজ, কীটনাশক, সারের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। পাট কাটার সময় পানির অভাবে অনেক কৃষককে ভোগান্তি পোহাতে হয়। সঠিক সময় জাগ দিতে না পারায় নষ্ট হয় পাটের রং।

চাষিরা বলছেন, এক বিঘা জমিতে হালচাষ থেকে শুরু করে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, নিড়ানি, কাটা, জাগ দেওয়া ও শ্রমিকসহ ঘরে তোলা পর্যন্ত খরচ পড়েছে ১২-১৫ হাজার টাকা। সেখানে বিঘাপ্রতি ফলন হচ্ছে ৭-১০ মণ।

শুরুতে পাটের দাম ২৬০০-২৮০০ টাকা মণ থাকলেও বর্তমানে বাজারে ১৯০০-২৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে লাভ তো দূরের কথা, খরচ তোলা নিয়েও চিন্তায় রয়েছেন তারা। অথচ গতবছর এসময়ে প্রতিমণ পাট বিক্রি হয়েছে ২৮০০-৩০০০ টাকায়।

সম্প্রতি নওগাঁর মান্দা উপজেলার সতিহাট গিয়ে দেখা যায়, এ হাটে ভোর থেকেই প্রান্তিক চাষিরা তাদের উৎপাদিত পাট ভ্যান-সাইকেলে করে বিক্রির জন্য নিয়ে আসছেন। এরপর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চলছে দর-কষাকষি। গড়ে প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে ১৯০০-২৩০০ টাকা। তবে বাজারে যে দামে পাট বেচাকেনা হচ্ছে তাতে চাষিকে পাট বিক্রি করে বিষন্ন মনে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে।

পাট বিক্রি করতে আসা উপজেলার গণেশপুর গ্রামের চাষি আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘একবিঘা জমিতে পাটচাষ করেছি। খরার কারণে সেচ দিয়ে পাটচাষ করতে অনেক কষ্ট হয়েছে। এবার পাটচাষে অনেক খরচ হয়েছে। কিন্তু সেই হিসেবে বাজারে পাটের দাম পাচ্ছি না। একবিঘা জমিতে আট মণ পাট পেয়েছি। আজ ২১০০ টাকা মণ বিক্রি করলাম। খরচের তুলনায় পাটের দাম নেই।’

তিনি বলেন, ‘বাজারে সিন্ডিকেট করে কম দামে পাট কেনেন ব্যবসায়ীরা। আমরা কৃষকরা যে রোদে পুড়ে জমিতে চাষ করি এর কোনো মূল্য নেই। সরকার এদিকে নজর না দিলে সামনে বছর থেকে মানুষ পাটচাষ করা ছেড়ে দেবে।’

একই উপজেলার চকরাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালাম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘খরার কারণে প্রথমেই পাটের গাছ মরে গেছে। সেচ দিয়ে কোনোরকম রক্ষা করা হয়েছে। একবিঘা জমিতে খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকা। পাট পেয়েছি সাত মণ। বিক্রি করতে গিয়ে পাচ্ছি ১৩-১৪ হাজার টাকা। এরকম হলে আমরা কিভাবে পাটচাষ করবো?’


নওগাঁ সদর থেকে পাট বিক্রি করতে এসেছেন মাহমুদুল হাসান তুহিন। তিনি বলেন, ‘অনাবৃষ্টির কারণে ফলন কম হয়েছে। এছাড়া পানির অভাবে সঠিক সময় পাট জাগ দিতে না পারায় কালার নষ্ট হয়ে গেছে। একে তো কালার নষ্ট হয়ে গেছে, এর মধ্যে আবার বাজারে পাটের দাম খুবই কম। আমরা কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাই না। হিসেব করে দেখলে পাটচাষে লস হবে।’


২৫-৩০ বছর ধরে পাটের ব্যবসা করছেন দিলিপ কুমার। এখান থেকে পাট কিনে খুলনা, যশোরসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, মোকামে বেচাকেনা না থাকায় পাটের দাম কমে গেছে। তবে আগামীতে দাম বাড়বে কি না বলা যাচ্ছে না।’

মতিন মোল্লা ও আব্দুল মজিদ নামে দুই ব্যবসায়ী বলেন, ‘গতবছর ২৯০০-৩০০০ টাকা মণ হিসেবে অনেক পাট কেনা আছে। সেই পাটই এখনো বিক্রি করতে পারিনি। মিলারদের পাট দিলে তারা টাকা দিতে চান না। আমাদের মতো ব্যসায়ীদের অবস্থা খুবই খারাপ। আমরাও চাই সরকার বাজার তদারকি করুক। এ দামে পাট বিক্রি করে কৃষকদের কিছুই হবে না।’

পাট ব্যবসায়ী শাহজামাল দয়াল বলেন, ‘গতবছরের পাট এখনো বিক্রি করতে পারিনি। পাট কেনার পর থেকে দাম কমে গেছে। চলতি বছর টাকা না থাকায় পাট কিনতে পারছি না।’

কথা হয় নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় কৃষকরা সঠিক সময়ে জমিতে পাটের বীজ বপন করতে পারেননি। পানির অভাবে জাগ দেওয়ার সমস্যার কারণে কৃষকরা পাটচাষ করতে চান না। এসব কারণে পাটের আবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম জমিতে চাষ হয়েছে। তবে পাটের ফলনে কোনো বিপর্যয় হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, জাগ দেওয়া নিয়ে সমস্যার কারণে চাষিদের রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাটের আঁশ ছাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

 

প্রিয় নওগাঁ/এফএস


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর